গন্ধ

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিলো—আজকের মতই। জানালার বাইরে, একইভাবে অশ্বথ গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির জলে সিক্ত হয়ে চিকচিক করছিলো—যেমনটা করছে আজকেও। সেগুন কাঠের সেই খাটটায়, যেটাকে এখন জানালা থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে আনা হয়েছে, সেখানে রান্ধিরের গায়ে নাক চাপা দিয়ে শুয়ে ছিলো একটা মারাঠি মেয়ে।

জানালার বাইরে, অশ্বথ গাছের পাতাগুলো লম্বা কানের দুলের মত ধিকিধিকি কাঁপছিলো রাতের ধূসর অন্ধকারে। মারাঠি মেয়েটা নিজের শরীরে সেই একই রকমের কাঁপুনি নিয়ে সেঁটে ছিলো রান্ধিরের গায়ে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলো, ইংরেজি পত্রিকার সবগুলো খবর, এমনকি বিজ্ঞাপনগুলোও পড়ে পড়ে সারাটা দিন কাটিয়ে, রান্ধির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো খোলা হাওয়ায় একটু নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে। সেখান থেকেই মেয়েটাকে সে দেখতে পেয়েছিলো, একটা তেঁতুল গাছের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। সম্ভবত মেয়েটা ছিলো পাশেই অবস্থিত দড়ি ফ্যাক্টরির একজন কর্মী। রান্ধির গলা খাঁকারি দিয়ে মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো এবং অঙ্গভঙ্গি করে ইশারায় তাঁকে বলেছিলো উপরে উঠে আসতে।

বেশ কিছুদিন ধরেই রান্ধির খুব একা অনুভব করছিলো। যুদ্ধের কারণে, সবগুলো খ্রিস্টান মেয়ে, যাদেরকে আগে সস্তায় পাওয়া যেতো, গণহারে গিয়ে ‘ওম্যান’স অক্সিলারি ফোর্স’ এ যোগদান করেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ফোর্ট অঞ্চলে নাচের স্কুল খুলে বসেছে, যেখানে কেবল সাদা চামড়ার ব্রিটিশ সৈন্যদের প্রবেশাধিকার আছে। রান্ধিরের গভীর বিষণ্ণতার কারণ হলোঃ এক দিকে, খ্রিস্টান মেয়েগুলো হয়ে গেছে দুষ্প্রাপ্য, অন্যদিকে, সে সাদা চামড়ার সৈন্যগুলোর চেয়ে আরও পরিশুদ্ধ, আরও শিক্ষিত, সুদেহি এবং সুদর্শন হওয়া সত্ত্বেও ড্যান্স ক্লাবের দরজাগুলো তাঁর জন্যে বন্ধ থাকে শুধুমাত্র তাঁর গায়ের চামড়াটা সাদা নয় বলে।

যুদ্ধের আগে, নাগপাড়ার কাছে আর তাজ হোটেলের ওখানে অনেক খ্রিস্টান মেয়ের সাথেই রান্ধির যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে। সে জানতো এই সম্পর্কগুলোর ধরন কেমন। সে খ্রিস্টান খচ্চরগুলোর চেয়েও খুব ভালো করে জানতো, খচ্চরগুলোর সাথে মেয়েগুলো রোমান্টিক সম্পর্ক চালিয়ে যায় তো শুধুমাত্র ফ্যাশনের খাতিরে, কিন্তু ব্যতিক্রমহীনভাবে মেয়েগুলোর শেষ পরিণতি হয় সাদা চামড়ার কোন এক নিষ্কর্মাকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে।

সত্যি কথা বলতে, রান্ধির ইশারা করে মেয়েটাকে উপরে ডেকেছিলো কেবলমাত্র হ্যাযেলের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে। হ্যাযেল নিচের ফ্ল্যাটেই থাকতো। প্রত্যেক সকালে, মেয়েটা তাঁর ইউনিফর্মটা গায়ে জড়িয়ে, খাকি টুপিটাকে মাথার যে পাশের চুলগুলো ছোট সে পাশে একটু হেলিয়ে, এমন ভঙ্গিতে ফুটপাতের উপর পা বাড়াতো, মনে হতো যেন সে আশা করছে এখনই রাস্তার সবগুলো পথিক এসে তাঁর পায়ের কাছে গালিচার মত নিজেদের বিছিয়ে দেবে। রান্ধির অবাক হয়ে ভাবতো কেন সে এই খ্রিস্টান মেয়েগুলোর দিকে এত আকৃষ্ট হয়। কোন সন্দেহ নেই যে মেয়েগুলো তাঁদের শরীরের লোভনীয় অংশগুলো ভালো করেই বের করে রাখে, নিজেদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব নিয়ে একদম দ্বিধাহীন কণ্ঠে আলাপ করে; তাঁদের পুরনো প্রেমিককে নিয়ে গল্প করে; এবং যখনই কোন ড্যান্স মিউজিক তাঁদের কানে ভেসে আসে, তখনই তাঁরা পা নাচানো শুরু করে……..সবই ঠিক আছে, কিন্তু এইসব গুণাবলী তো যে কোন মেয়েরই থাকতে পারে।



মারাঠি মেয়েটাকে যখন ইশারায় উপরে ডেকেছিলো, তখন তাঁর সাথে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার কোন চিন্তাই রান্ধিরের মাথায় আসেনি। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর, মেয়েটার গায়ের ভেজা কাপড়গুলো দেখে সে ভাবলো “বেচারি না আবার নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে ফেলে।” তারপর বললো, “গায়ের কাপড়গুলো খুলে ফেলো, নয়তো ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”

মেয়েটা রান্ধিরের কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলো। তাঁর চোখের শিরাগুলো রক্তিম হয়ে উঠেছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন সাঁতার কাটবে। রান্ধির যখন নিজের পরনের সাদা ধুতিটা খুলে হাত বাড়িয়ে তাঁকে দিলো, সে কিছুক্ষণ ভেবে নিলো, তারপর তাঁর গায়ের ভেজা ময়লা পাস্তা শাড়িটা খুলে ফেললো। শাড়িটাকে একপাশে রেখে তাড়াহুড়ো করে ধুতিটা দিয়ে সে তাঁর উরুদ্বয় ঢেকে নিলো। তারপর গায়ে আঁটসাঁটভাবে সেঁটে থাকা ব্লাউজটা খোলা শুরু করলো, কিন্তু ব্লাউজের দুই মাথা দিয়ে বাঁধা ছোট গিঁটটা তাঁর স্ফীত, নোংরা স্তন যুগলের সন্ধিস্থলে হারিয়ে গিয়েছিলো।

সে অনেকক্ষণ ধরে তাঁর আঙ্গুলের জীর্ণ নখগুলো দিয়ে ব্লাউজের গিঁটটা খোলার চেষ্টা করলো, কিন্তু বৃষ্টির জলে গিঁটটা ইতিমধ্যে অনেক টাইট হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে খোলার আশা ছেড়েই দিলো। রান্ধিরকে মারাঠি ভাষায় কিছু একটা বললো, যার অর্থ ছিলোঃ “আমি কি করব? এটা তো খুলবে না।”

রান্ধির এসে তাঁর পাশে বসলো। এবার সে চেষ্টা চালাতে লাগলো। কিন্তু অচিরে সেও ক্লান্ত হয়ে পড়লো। শেষে দুইহাতে ব্লাউজের দুইটা মাথা ধরে রান্ধির জোরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলো। খুলে গেলো গিঁটটা। রান্ধিরের হাতগুলো মেয়েটার সমস্ত বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। ব্লাউজের ভেতর থেকে লাফিয়ে বের হয়ে তাঁর হাতে এসে পড়লো দুটো সুডৌল কম্পমান স্তন। এক মুহূর্তের জন্যে রান্ধিরের মনে হলো তাঁর হাতগুলো যেন, একজন দক্ষ কুম্ভকারের মতই, ফেটানো মাটির দলা দিয়ে মারাঠি মেয়েটার বুকের উপর দুটো নরম পেয়ালা বানিয়ে দিলো। একজন কুম্ভকারের হাতে সদ্য নির্মিত জলসিক্ত মাটির পাত্রের মত একই রকম আধা-পাকা, রসালো ভাব, একই আবেদন, একই শীতল উষ্ণতা বিরাজ করছিলো মেয়েটার স্তন যুগলে। অদ্ভুত এক আভায় জ্বলজ্বল করছিলো তাঁর যৌবন মিশ্রিত, দাগহীন স্তনগুলো। যেন চামড়ার কালো আর হালকা বাদামী রঙ্গের নিচে একটা মৃদু আলোর স্তর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো আভাটা, মনে হচ্ছিলো যেন এই আছে, এই নেই। তাঁর বুকের উঁচু ডিবি দুটো দেখতে ঠিক পুকুরের ঘোলা জলে ভাসিয়ে দেয়া একজোড়া মাটির প্রদীপের মতই লাগছিলো।

হ্যাঁ, সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিলো—আজকের মতই। অশ্বথ গাছের পাতাগুলি ধিকিধিকি কাঁপছিলো জানালার বাইরে। মারাঠি মেয়েটার ভেজা কাপড়গুলো একটা ময়লা গাদার মতই পড়ে ছিলো মেঝেতে। আর মেয়েটা সেঁটে ছিলো রান্ধিরের গায়ে। তাঁর নোংরা, নগ্ন শরীরের উষ্ণতাটা রান্ধিরের শরীরে ঠিক হাড় কাঁপুনি শীতে পাবলিক বাথরুমে গরম পানি দিয়ে গোসল করার যে অনুভূতি, সেই একই অনুভূতি জাগিয়ে তুললো।

সারা রাত মেয়েটা রান্ধিরের গায়ের সাথেই সেঁটে রইলো। দুজনের দুটো দেহ একটা আরেকটার সাথে গলে-মিশে একাকার হয়ে গেলো। দুয়েকটা মামুলি শব্দ ছাড়া তাঁদের মধ্যে আর কোন কথাবার্তার বিনিময় হলো না, কিন্তু যা কিছু বলার ছিলো সবই বলে দিয়েছিলো তাঁদের ঠোঁট, নিঃশ্বাস, আর হাত। সারা রাত, হালকা বাতাসের মত স্নেহস্পর্শে রান্ধির তাঁর হাত বোলাল মারাঠি মেয়েটার স্তনগুলোর উপর। তাঁর হাতের স্পর্শে স্তনের ছোট বোঁটাগুলো আর বোঁটার চারপাশে কালো বৃত্তে ছড়িয়ে থাকা মাংসল ডেলাগুলোতে একটা অনুভূতি জেগে উঠলো, আর এই অনুভূতিতে একটা শিহরণ বয়ে গেলো মেয়েটার পুরো শরীরে, যা রান্ধিরের শরীরেও কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো।



এই ধরণের কাঁপুনি আর তাঁর সুখানুভূতির সাথে রান্ধির অনেক আগে থেকেই সুপরিচিত। মেয়েদের নরম, সুডৌল স্তনের সাথে নিজের বুক চেপে শুয়ে থাকা অবস্থায় এমন বহু রাত সে আগেও কাটিয়েছে। রান্ধির এমনসব মেয়ের সাথেও রাত কাটিয়েছে যারা ছিলো পুরোপুরি আনাড়ি। যেইসব মেয়েরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে তাঁদের ঘরের এমনসব গল্প তাঁকে শোনাত যা কোন মেয়েই কোন আগন্তুককে শোনানোর কথা নয়। সে এমনও মেয়ের সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয়েছে যারা নিজেরাই নিজ উদ্যমে সবকিছু করে দিতো এবং তাঁকে কখনো কোনভাবেই ভারাক্রান্ত করতো না। কিন্তু এই মারাঠি মেয়েটা, তেঁতুল গাছের নিচে ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা, যাকে সে ইশারায় ডেকেছিলো উপরে, সে ছিলো একেবারেই ভিন্ন, অন্যরকম।

সারা রাত মেয়েটার শরীর থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ এসে মিশে গিয়েছিলো রান্ধিরের নিঃশ্বাসে। গন্ধটা ছিলো বিশ্রী এবং একই সময়ে মিষ্টি। রান্ধির নিঃশেষে পান করেছিলো পুরোটা গন্ধ। তাঁর বগল, তাঁর স্তন, তাঁর চুল, তাঁর পিঠ—তাঁর পুরো শরীর থেকেই গন্ধটা এসে প্রবেশ করছিলো রান্ধিরের নেয়া প্রতিটা নিঃশ্বাসে। সারা রাত রান্ধির ভাবলো, এই মারাঠি মেয়েটা তাঁর এতটা কাছে থাকা সত্ত্বেও সে কোন প্রকার ঘনিষ্ঠতাই অনুভব করতো না, যদি মেয়েটার নগ্ন শরীর থেকে বেরিয়ে আসা অদ্ভুত গন্ধটা এসে তাঁর নাকে না লাগতো। গন্ধটা চুয়ে চুয়ে ঢুকে পড়েছিলো তাঁর মনের প্রতিটা খাঁজে, দখল করে ফেলেছিলো তাঁর নতুন এবং পুরনো সবগুলো চিন্তা।

গন্ধটা রান্ধির আর মেয়েটাকে ঐ রাতের জন্যে একসাথে ঝালাই করে ফেলেছিলো। তাঁরা ঢুকে পড়েছিলো একে অন্যের ভিতরে। ডুবে গিয়েছিলো গভীরে, খুব গভীরে, দুজনে হয়েছিলো এক, মিশে গিয়েছিলো বিশুদ্ধ স্বর্গীয় সুখে, যে সুখ ক্ষণস্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও স্থায়ী, যে সুখ আকাশে উড়ে বেড়ানো উড়াল যান হয়েও নিশ্চল এবং স্থবির। দুজনে মিলে হয়ে গিয়েছিলো একটা পাখি, যে পাখি উপরে, অনেক উপরে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায় আকাশের নীলে, তখন পাখিটাকে দেখলে মনে হয় স্থির, নিশ্চল।

মারাঠি মেয়েটার শরীরের প্রতিটা লোমকূপ থেকে বেরিয়ে আসা গন্ধটাকে রান্ধির চিনতে পেরেছিলো, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছিলো না ভাষায়, তুলনা করতে পারছিলো না অন্য কোন কিছুর সাথেঃ মনে হচ্ছিলো কাদায় পানি ছিটালে যে গন্ধ বেরিয়ে আসে এটা সেরকমই। কিন্তু না, এই গন্ধটা ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা, এখানে ল্যাভেন্ডার কিংবা আতরের সুগন্ধের মত কোন কৃত্রিমতা ছিলো না; এটা ছিলো পুরোপুরি সাচ্চা, নারী-পুরুষের একীভূত সম্পর্কের মতই, বাস্তব আর অমর।

রান্ধির ঘামের গন্ধকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতো। গোসল সারার পর, সাধারণত সে তাঁর বগলে সুগন্ধি পাউডার মাখতো; অথবা অন্য কিছু দিয়ে ঢেকে দিতো ঘামের গন্ধটা। কিন্তু এখন আশ্চর্যের বিষয় হলো, মেয়েটার লোমশ বগলে চুমু খেতে গিয়ে সে কোন প্রকার বিরাগতাই অনুভব করলো না; উল্টো সে অনুভব করলো এক ধরণের অদ্ভুত সুখ। মেয়েটার বগলের নরম চুলগুলো ঘামে সিক্ত হয়ে উঠেছিলো। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা গন্ধটাকে অনেক ভাবে বোধগম্য মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত এটার পরিষ্কার কোন অর্থই দাঁড় করানো গেলো না। রান্ধিরের মনে হলো, সে গন্ধটাকে জানতো, চিনতো, এমনকি বুঝতে পেরেছিলো এটার অন্তর্নিহিত অর্থ, কিন্তু কারো কাছে এটাকে ভাষায় প্রকাশ করার কোন শব্দ তাঁর জানা ছিলো না।

হ্যাঁ, সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিলো—আজকের মতই। সেই একই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে দেখলো, অশ্বথ গাছের পাতাগুলো ধিকিধিকি কাঁপছে। পাতাগুলোর কাঁপুনির শব্দ আর বাতাসের খসখস ধ্বনিটা যেন একীভূত হয়ে মিশে গেছে একসাথে। তখন ছিলো অন্ধকার, কিন্তু কিছু আলোক রশ্মি পুরোটা অন্ধকারকে করে রেখেছিলো পরিপ্লুত, যেন একটু তারার আলো বৃষ্টির জলে ভর করে নেমে এসেছিলো মাটিতে।

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিলো, যখন রান্ধিরের ঘরে ছিলো কেবল একটা সেগুন কাঠের খাট। এখন সেখানে যোগ হয়েছে আরেকটা; আর ঘরের কোনায় রাখা হয়েছে একটা নতুন ড্রেসিং টেবিল। সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিলো, সেই একই ঋতু, বৃষ্টির জলে ভর করে একটু তারার আলো নেমে এসেছিলো মাটিতে। কিন্তু এখন বাতাসে ভাসছে মেহেদি ফুলের গন্ধ।

অন্য খাটটা খালি পড়ে আছে। খাটের এক পাশে রান্ধির উবু হয়ে শুয়ে বাহিরে অশ্বথ গাছের পাতার উপর বৃষ্টি ফোঁটার খেলাটা দেখছে, পাশেই একটা সাদা চামড়ার মেয়ে তাঁর নগ্ন শরীরের উপরের অংশটা হাত দিয়ে ব্যর্থ ভাবে ঢাকার চেষ্টা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাঁর লাল রেশমি সালওয়ারটা পড়ে আছে অন্য খাটটায়; সালোয়ারের গাঢ় লাল ফিতা থেকে একটা সুতার গোছা ঝুলে আছে একপাশে। তাঁর বাকী কাপড়গুলোও পড়ে আছে খাটের উপর—তাঁর ব্রা, তাঁর জাঙ্গিয়া, তাঁর সোনালি ফুলওয়ালা কামিজ, তাঁর ওড়না—পুরোপুরি লাল, আশ্চর্যজনক ভাবে লাল। কড়া মেহেদির গন্ধে সিক্ত হয়ে আছে সবগুলো কাপড়।



চিকচিকে ছোট আলোর কণা ধুলোর মতই এসে জমেছে মেয়েটার চুলে। তাঁর মুখের উপর, আলো, রুজ আর লিপস্টিক মিলেমিশে তৈরি করেছে একটা অদ্ভুত রং, মলিন এবং প্রাণহীন। ব্রা এর ফিতাগুলো দাগ ফেলেছে তাঁর শুভ্র বক্ষে।

তাঁর স্তনগুলোর রঙ দুধের মতই সাদা, কিন্তু হালকা নীলাভ। পরিষ্কার ভাবে চাঁচা তাঁর বগল, সেখানে কিছু ধূসর চুলের মুড়া দৃশ্যমান, যেন কেউ সুরমা লাগিয়ে দিয়েছে। রান্ধির মেয়েটার দিকে অনেকবার তাকিয়েছে এবং ভেবেছে, “মনে হচ্ছে যেন একটা কাঠের কার্টুন ভেঙ্গে বইয়ের গাদা কিংবা চায়না থালা-বাসনের মত আমি মেয়েটাকে সেখান থেকে বের করে এনেছি। এমনকি প্যাক করা বইয়ের গাদার মতই মেয়েটার গায়েও এখানে সেখানে লেগে আছে দাগ আর আঁচড়।”

যখন রান্ধির মেয়েটার গায়ের সাথে সেঁটে থাকা ব্রা এর টাইট ফিতাগুলো খুলেছিলো; তাঁর বুকের আর পিঠের নরম মাংসে দেখা যাচ্ছিলো ফিতার দাগগুলো। তাঁর কোমরেও সালোয়ারের টাইট ফিতা বাঁধার একটা দাগ দেখা গেলো। তাঁর গলার ভারী নেকলেসটা তাঁর ধারালো আগাগুলো দিয়ে আঁচড় কেটে গেছে তাঁর বুকের কমনীয় চামড়ায়, যেন কেউ নিষ্ঠুর ভাবে নখ চালিয়েছে সেখানে।

অবশ্যই, সেই দিনটা ছিলো আজকের মতই। টপটপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে অশ্বথ গাছের মসৃণ, নরম পাতাগুলোতে, তৈরি করছে সে একই শব্দ, যে শব্দ রান্ধির শুনেছিলো সেই রাতের পুরোটা সময়। আবহাওয়াটা সুন্দর; একটা শীতল মৃদু বাতাস বইছে; মেহেদী ফুলের কড়া গন্ধটা মিশে আছে তাতে।

রান্ধির এই ফ্যাকাসে, সাদা চামড়ার মেয়েটার দুধ-সাদা স্তনের উপর স্নেহস্পর্শে তাঁর হাত চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর আঙ্গুলগুলো মেয়েটার নরম শরীরে একটা শিহরণ জাগিয়ে তুলেছে। রান্ধির যখন তাঁর বুকের সাথে নিজের বুক মিশিয়েছে, সে শুনতে পাচ্ছিলো মেয়েটার শরীরের প্রতিটা শিরায় রক্ত প্রবাহের আওয়াজ। কিন্তু কোথায় সেই কাকুতি, সেই কান্না, মারাঠি মেয়েটার শরীরের গন্ধ থেকে যে কাকুতি এসে মিশে গিয়েছিলো রান্ধিরের নিঃশ্বাসে, যে কাকুতি দুগ্ধ তৃষ্ণায় কাতর একটা শিশুর কাকুতির চেয়ে আরও শক্তিশালী, আরও বোধগম্য, যে কাকুতি গলার আওয়াজকে অতিক্রম করে ভেঙ্গে গিয়ে ধীরে হয়ে যায় অশ্রুত?

রান্ধির জানালার গ্রিলের মধ্য দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। অশ্বথ গাছের পাতাগুলি এখন খুব কাছে, কিন্তু সে পাতাগুলোকে ছাড়িয়ে চোখ ফেলেছে আরও দূরে, সেখানে ঝাপসা মেঘের মধ্যে দিয়ে উঁকি দিয়েছে একটা অদ্ভুত মৃদু আলো, একটা অদ্ভুত আলো, যে আলোর আভা সে দেখেছিলো মারাঠি মেয়েটার স্তনে, একটা অদ্ভুত আলো, যে আলো পুরোটাই একটা রহস্য, যে রহস্যের আধেয় একই সাথে লুকায়িত, একই সাথে প্রকাশিত।

রান্ধিরের বাহুতে, শুয়ে আছে একটা সাদা চামড়ার মেয়ে, যার পুরো শরীরটা ঠিক দুধ আর মাখন মিশ্রিত ময়দার তালের মতই নরম, তুলতুলে। এখন মেয়েটার ঘুমন্ত শরীর থেকে মেহেদী ফুলের একটা ক্লান্ত গন্ধ এসে নাকে লাগছে; রান্ধিরের কাছে এই গন্ধটা মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের মতই অপ্রীতিকর, আর ঢেকুরের মতই অম্ল। রংহীন। নিরানন্দ। বিমর্ষ।

রান্ধির তাঁর বাহুতে শুয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে, যেভাবে কেউ তাকিয়ে থাকে ঝমাট বাঁধা দুধের দিকে, যেখানে প্রাণহীন ছোট ছোট শুভ্র দলা ভেসে বেড়ায় দুধের উপরের ঘোলা জলের উপর। একই ভাবে, এই মেয়েটার নারীত্বও রান্ধিরকে জমিয়ে দিয়েছে ঠাণ্ডায়। রান্ধিরের দেহ আর মনকে এখনো আবিষ্ট করে রেখেছে মারাঠি মেয়েটার শরীর নিঃসৃত সেই প্রাকৃতিক গন্ধটা; যে গন্ধ মেহেদী ফুলের এই গন্ধটার চেয়ে হাজার গুন বেশী সূক্ষ্ম, বেশী সুখকর; যে গন্ধকে নিঃশ্বাসে টেনে নিতে তাঁর বিন্দু পরিমাণও বাধেনি, যে গন্ধ নিজে নিজেই ঢুকে পড়েছিলো তাঁর অভ্যন্তরে এবং সে অনুধাবন করেছিলো গন্ধটার সত্যিকার উদ্দ্যেশ্য।

শেষ বারের মত, রান্ধির এই মেয়েটার দুধ-সাদা শরীরটাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু তাঁর নিজের শরীরে কোন শিহরণ জাগলো না।

তাঁর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী, একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে, বি.এ পাশ, ছিলো কলেজের অসংখ্য ছেলের হৃদয়ের স্পন্দন, সে এখন ব্যর্থ হলো তাঁর স্বামী রান্ধিরের শিরার স্পন্দন বাড়াতে।

মেহেদী ফুলের সাংঘাতিক গন্ধটার ভিড়ে, রান্ধির খুঁজতে লাগলো সেদিনের সেই গন্ধটা, সেই বর্ষার দিনে, যেদিন খোলা জানালার বাহিরে চিকচিক করছিলো অশ্বথ গাছের পাতাগুলি, যেদিন তাঁর নিঃশ্বাসে মিশে গিয়েছিলো একটা মারাঠি মেয়ের নোংরা শরীর থেকে বেরিয়ে আসা এক অদ্ভুত গন্ধ।

মূলঃ বু — সাদাত হাসান মান্টো

Comments

comments

673 views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *