সুখের হিসাবঃ সভ্যতার উন্নয়নে আমরা কি দিনে দিনে সুখী হইয়া উঠতেছি?

ইতিহাসে গত পাঁচশ বছরে অনেকগুলা ধারাবাহিক উত্তেজনাপূর্ণ বিপ্লব ঘইটা গেছে। এরই মধ্যে পুরা দুনিয়াটা একটা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হইছে। অর্থনৈতিক উন্নতি হইছে উল্লেখযোগ্য হারে, মানবজাতি এখন এতসব সম্পদ আর এমনসব জিনিসপত্র ভোগ করতেছে যা একসময় কেবল রূপকথায় সম্ভব ছিল। বিজ্ঞান আর শিল্প বিপ্লব মানুষরে সুপার হিউম্যান পর্যায়ে নিয়া গেছে। লিটারেলি মানুষের কাছে আছে এখন লিমিটলেস এনার্জি। রাজনীতি, সমাজনীতি, ডেইলি লাইফ আর মানুষের সাইকোলজিতে ঘটছে আমূল পরিবর্তন।

কিন্তু এতে কি আমরা আগের চাইতে আরও বেশী সুখী হইয়া উঠছি? গত পাঁচ শতাব্দী ধইরা মানবজাতি যেই পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জিভূত করছে সেই সম্পদরে কি সে নতুন কোন সুখ অথবা পূর্ণতায় রূপান্তরিত করতে পারছে? আমাদের আবিষ্কৃত অফুরন্ত এনার্জি রিসোর্স কি এখন আমাদের সামনে সুখের নতুন কোন দোকান খুইলা দিছে? যদি আরও পেছনে চইলা যাই, ধরেন প্রস্তর যুগেরও আগে ফিরা গেলাম, তখন থাইকা শুরু কইরা পরে ঘইটা যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কগনিটিভ রেভ্যুলুশন কি দুনিয়াটারে বাইচা থাকার জন্যে আরও উত্তম কইরা তুলছে? সম্প্রতি নীল আর্মস্ট্রং এর চাঁদের বুকে পায়ের ছাপ রাখার ঘটনাটা কি তিরিশ হাজার বছর আগে শভেট গুহার দেয়ালে হান্টার গ্যাদারারদের হাতের ছাপ রাখার ঘটনার চাইতেও সুখের বিষয় হইয়া গেছে? যদি তা না হয়, তাইলে কৃষির এত উন্নতি কইরা, এত এত শহর-বন্দর গইড়া তুইলা, লেখালেখি কইরা, মুদ্রা বানাইয়া, সাম্রাজ্য বানাইয়া, বিজ্ঞান আর শিল্প কারখানার উন্নতি দিয়া আসলে কি লাভ হইলো?

ইতিহাসবিদরা সাধারণত এই ধরণের প্রশ্ন তেমন একটা করে না। তাঁরা কখনো জিজ্ঞেস করে না ব্যাবিলনের নাগরিকরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের চাইতে বেশী সুখী ছিল কিনা, তাঁরা জিজ্ঞেস করে না মিশরের ধর্মীয় উত্থান মিশরীয়দের জীবনে সুখ নিয়া আসলো কিনা, তাঁরা জিজ্ঞেস করে না আফ্রিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যের পতন অগণিত মানুষের জীবনের সুখরে তরান্বিত করলো কিনা। অথচ এই প্রশ্নগুলাই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়ার কথা ছিল। বর্তমান কালের আইডিওলজিগুলা আর পলিটিকাল প্রোগ্রামগুলা মানুষের সত্যিকারের সুখের যে উৎসের উপর ভিত্তি কইরা গইড়া উঠে সেখানে সুখের আইডিয়াটা তেমন জোরালো না, বরং অনেক ভঙ্গুর। জাতীয়তাবাদীরা বিশ্বাস করে যে রাজনৈতিক আত্ম নির্ধারণই কেবল মানুষের সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে। কম্যুনিস্টদের দাবি হইলো, প্রলেতারিয়াতদের শাসনের নিচেই কেবল সকল মানুষ স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করতে পারবে। ক্যাপিটালিস্টরা প্রচার করে যে, অর্থনৈতিক উন্নতি, মেটেরিয়াল প্রাচুর্যতা, মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা আর ফ্রি মার্কেটই কেবল বেশী বেশী মানুষের বেশী বেশী সুখের নিশ্চয়তা দিতে পারে।
আসলেই কি তাই? যদি কোন সিরিয়াস গবেষণা সুখের এইসব হাইপথেসিসরে বাতিল ঘোষণা কইরা দেয় তাইলে কি ঘটবে? অর্থনৈতিক উন্নতি আর আত্মনির্ভরশীলতা যদি মানুষরে সুখী কইরা তুলতে না পারে, তাইলে এই পুঁজিতন্ত্র দিয়া আমাদের কি লাভ? কি হইব, যদি আমরা বুঝতে পারি যে এখনকার স্বাধীন রাষ্ট্রগুলার চাইতে আগেকার বড় বড় সাম্রাজ্যের মানুষগুলাই বেশী সুখী ছিলো, উদাহরণ স্বরূপ, আলজেরিয়ানরা তাঁদের নিজেদের শাসকের চাইতে ফেঞ্চ শাসকের আন্ডারেই বেশী সুখী ছিল? তাইলে ডিকলোনাইজেশনের মধ্যে দিয়া আমাদের এই জাতিয়াবাদি হইয়া উঠার আসলে মূল্যটা কি রইলো?

এই সবগুলাই এখন হাইপথেটিকাল সম্ভাবনা হিসেবে আমাদের সামনে ঝুইলা আছে। এর কারণ, ইতিহাসবিদরা এই প্রশ্নগুলারে এড়াইয়া গেছেন। তাঁরা ইতিহাসের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, লিঙ্গ, রোগবালাই, যৌনতা, খাদ্য, আর বস্ত্র নিয়া ব্যাপক গবেষণা চালাইলেও, কখনই একটু দাঁড়াইয়া চিন্তা করে নাই এই সবকিছু আসলে কিভাবে মানুষের সুখরে তরান্বিত করে।

যদিও কিছু স্কলার অল্পবিস্তর গবেষণা কইরা বলতেছে যে, সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে মানুষের সুখ তরান্বিত হইতেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটা একেবারেই কনভিন্সিং না। কারণ, আমরা ইতিমধ্যেই দেখছি যে নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নতুন নতুন আচরণ আর দক্ষতা আসলে জীবনরে সুখী কইরা তুলে নাই। কৃষি বিপ্লবের আগে মানুষ শুধু পশু পাখি শিকার কইরাই খাইত। মানুষের দক্ষতা ছিল খুবই কম। প্রকৃতির উপরে মানুষের তেমন কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কৃষি বিপ্লবের পরে মানুষ শিখতে পারলো কিভাবে তাঁর আশে পাশের পরিবেশরে শেইপে আনতে হয়। এতে মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ল, পাশাপাশি মানুষ হইয়া উঠল অনেক রুক্ষ। কারণ তখন সবাইরেই তাঁর পূর্বপুরুষের চাইতে অনেক বেশী পরিশ্রম করতে হইত। মানুষের উৎপাদন আর কর্মক্ষমতার সাথে সম হারে বাড়তে লাগল মানুষের অশান্তি আর রোগ বালাই। একই ভাবে সেই কৃষি বিপ্লব থাইকা আজকের এই ‘এইজ অব টেকলোজি’ পর্যন্ত পুরো সময়টার উপরে গভীর দৃষ্টি রাখলে দেখা যায়, সবকিছুতে মানুষের ক্যাপাসিটি উল্ল্যেখযোগ্য হারে বাড়লেও, জীবন আসলে তেমন আরামের অথবা সুখের হইয়া উঠে নাই মোটেও, উল্টা আরও জটিল হইয়া উঠছে।

তবে হ্যাঁ, জীবনরে জটিল কইরা হইলেও এই যে আমরা নিজেদের এত উন্নতি সাধন করছি এই জন্যে আমরা আমদেরকে অভিনন্দন জানাইতে পারি। এবং এই ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীকুলরে একেবারে ইগনোর করতে হইব আর কি! কারণ, মানুষের যত উন্নতি, আর এই উন্নতির যত এক্সপেরিমেন্ট তাঁর সবই আমরা চালাইছি এনিম্যালদের উপরে। আমরা শুধু আমাদের উন্নতির কথাই চিন্তা করছি, কিন্তু অন্যান্য প্রাণীকুলদের কথা চিন্তা করি নাই একেবারেই, উল্টা এদের উপরে টর্চার কইরা আমরা আমাদের সো কলড উন্নয়নের পথ খোলাসা করছি। যদি আমরা বর্তমানে এনিম্যাল একটিভিস্টদের যেইসব দাবি আছে তাঁর দশ ভাগের এক ভাগও আমলে আনি, তাইলে দেখা যাবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল হইল আমাদের আধুনিক শিল্প কারখানা ভিত্তিক কৃষি ব্যাবস্থা। এখন এই ক্রমিনালের বিচার করবে কে? সুতরাং যখন আমরা বৈশ্বিক সুখ নিয়া চিন্তা করব, তখন অবশ্যই আমরা শুধু উচ্চ শ্রেণীর মানুষ, ইউরোপিয়ান অথবা শুধু পুরুষদের সুখরেই আমলে নিব না। যদি নেই তাহলে এইটা হবে মারাত্মক ভুল। এবং সম্ভবত অন্যান্য প্রাণীকুলের কথা চিন্তা না কইরা শুধু মানবজাতির সুখরেই বিবেচনায় আনাটাও হইবে একটা অলমোস্ট মারাত্মক ভুল।

এখন মূল প্রশ্ন হইলো, সুখ জিনিসটা আসলে কি? এইটা কিভাবে আসে? এইটা কি আসলেই বাহির থাইকা আসে নাকি আমাদের ভিতরেই এইটার বসবাস? নাকি ভিতর বাহির দুইটারে একসাথে মিলাইতে পারলেই আমরা সত্যিকারের সুখী হইয়া উঠবো? উত্তরে প্রথমত বলা যায়, সুখের উপর বাহিরের ঘটনা একটা বড় ধরণের প্রভাব অবশ্য ফালায়। যেমন, একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ যদি হঠাৎ লটারিতে এক কোটি টাকা জিতা যায়, তাইলে এই টাকা তাঁর জীবনে নিশ্চিত ভাবে সুখ নিয়া আসবে। এখন কথা হইলো, টাকায় কি তাইলে সুখ পাওয়া যায়? প্রায় সবাই তো টাকার পেছনে দৌড়ায় তা দিয়া সুখ কিনতে পারবে বইলা। কিন্তু দাঁড়ান, যেই মানুষটা লটারিতে এক কোটি টাকা জিতল, এই টাকা তাঁর জীবনে সুখ নিয়া আসলেও, সেই সুখ বেশীদিন টিকবে না। এইটা কয়েক মাস অথবা কয়েক বছর টিকবে। তারপর সে তাঁর টাকাওয়ালা জীবনে অভ্যস্ত হইয়া পড়ার পর, তাঁর সুখের ভলিউম আবার লটারি জিতার আগের পর্যায়ে নাইমা যাইব।

অনেক ক্ষেত্রে মানুষের শারীরিক সুস্থতার উপরেও সুখের উঠানামা নির্ভর করে। অসুস্থ মানুষরা সাধারণত সুস্থ মানুষের চাইতে দুঃখী হয়। কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষ যখন তাঁর এই অসুস্থতার সাথে নিজেরে এডজাস্ট কইরা ফালায় তখন আবার তাঁর অসুস্থতা জনিত দুঃখটা নাই হইয়া যায়। যেমন, ডায়াবেটিক রোগীরা প্রথমে তাঁদের এই রোগ নিয়া খুব পীড়িত হইয়া পড়ে, পরে এক সময় তাঁরা এই রোগের সাথে বসবাস করতে করতে নরমাল মানুষের মতই হইয়া যায়, অর্থাৎ তাঁদের সুখ-দুঃখ তখন অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, রোগের উপর না।

এই বিষয়ে একটা গল্প বলি শুনেন, লুসি আর লিউক নামে দুই মধ্যবিত্ত যমজ ভাই-বোন ছিল। একদল সাইকোলজিস্ট এই দুই ভাই-বোনের উপরে সুখ নিয়া একটা গবেষণা চালাইতে চাইলো। দুইজন এতে রাজিও হইয়া গেল। সাইকোলজি ল্যাব থাইকা বাসায় ফিরার পথে লুসির গাড়ি একটা বাসের সাথে ধাক্কা খাইল। এতে লুসির শরীরের বেশ কিছু হাড় ভাইঙ্গা গেল, এবং একটা পাও স্থায়ীভাবে অকেজো হইয়া গেলো। ঠিক যেই মুহূর্তে উদ্ধার কর্মীরা লুসিরে কাইটা বিদ্ধস্ত গাড়ির ভিতর থাইকা বাহির করতেছিলো, সেই মুহূর্তেই লিউকের ফোনের রিং বাইজা উঠলো। ফোন ধইরা লিউক জানতে পারলো যে সে জ্যাকপট লটারিতে ১০ মিলিয়ন ডলার জিতছে। একই দিনে দুই ভাই বোনের জীবন সাংঘাতিকভাবে দুই দিকে মোড় নিলো। দুই বছর পরে দেখা গেল লুসি বেচারি পাও ছাড়া হামাগুড়ি দিয়া চলে, আর লিউক হইলো মস্ত বড়লোক। কিন্তু কিছুদিন পরে যখন সাইকোলজিস্টরা দুই জনের উপরে একটা ফলো আপ স্টাডি করতে আসলো, তখন সুখ নিয়া বিভিন্ন প্রশ্ন করায় দুই জন একই উত্তর দিল, যেই উত্তরগুলা দুই জন সেই দুর্ঘটনা আর লটারি জিতার আগে দিছিল। এর কারণ দুই জন ইতিমধ্যেই তাঁদের ভাগ্যের সাথে এডজাস্টেড হইয়া গেছে। সেই দিনের এত বড় ঘটনার প্রভাব এখন তাঁদের জীবনে থাইকা গেলেও, তাঁদের মনে সেইটা নাই। মন এমনই বেশীদিন এক জিনিস নিয়া পইড়া থাকতে পারে না।

সুতরাং বোঝা গেল, মানুষের জীবনে যেই ধরণের এক্সটারনাল ঘটনাই ঘটুক না কেন, সেইটা ভালো হোক আর মন্দ হোক, সেইটা সাময়িক সময়ের জন্যে তাঁর সুখ-দুঃখরে তরান্বিত করলেও, এক সময় ঠিকই তাঁর এই ঘটনা নিয়া এক্সাইটমেন্ট অথবা ডিপ্রেশন কাইটা গিয়া আবার নরমাল হইয়া যায়। এবং আরেকভাবে বলা যায় এক্সটারনাল কোন ঘটনা আসলে আমাদের সুখরে তরান্বিত করে না। সুখ তরান্বিত হয় এক্সটারনাল ঘটনার উপর আমাদের ইন্টারনাল রিয়েকশনের উপর ভিত্তি কইরা অর্থাৎ যেই ঘটনাটা ঘটলো সেইটা নিয়া আপনে কিভাবে রিয়েক্ট করবেন, সেইটার উপর নির্ভর করবে আপনে কতখানি সুখী অথবা দুঃখী হইবেন। তাই গৌতম বুদ্ধ বলছিল, “Pain is inevitable, but suffering is optional.”

সুখ যদি আমাদের ভিতরের জিনিসই হইয়া থাকে, তাইলে কি সভ্যতার এই উন্নতি আর অগ্রগতি থামাইয়া দেওয়া উচিত? উত্তর হইলো, সভ্যতা এখন যেই পর্যায়ে আসছে, সেইখানে এই অগ্রগতি থামানো সম্ভব না, এবং থামানোর চেষ্টা করাও উচিত না। সভ্যতার সো কলড উন্নতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হইল, এই উন্নতির বেশীরভাগ জিনিসই হইলো অপ্রয়োজনীয়। আমাদের জীবনটা এখন অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ভরপুর, আর আমরা প্রায় সবাই অকামে ব্যস্ত। তাই এক জ্ঞানী লোক একবার বলছিল, “Sin is that which is unnecessary.”

শেষে আইসা কইতে চাই, অনেক তো হইলো। এখন সময় আসছে, এই অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর কাজকর্ম থাইকা আমাদের মনযোগ ফিরাইয়া জীবনের দিকে নিয়া আসার। এখন সময় আসছে, উন্নতির পাশাপাশি সুখের দিকে একটু নজর দেওয়ার। এখন সময় আসছে, বাহিরের দুনিয়ার পাশাপাশি আমাদের ভেতরে যে বিশাল রহস্যজনক একটা দুনিয়া আছে সেইটার দিকে চোখ ফেলার। এখন সময় আসছে, আমাদের অস্তিত্বের সাগরে ডুব দেওয়ার। এখন সময় আসছে, এইটা অনুধাবন করা যে, সুখের জন্যে বাহিরে হাতড়ানো, টাকার পেছনে হন্য হইয়া দৌড়ানো আর পকেট ভর্তি হীরা-জহরত নিয়া রাস্তায় রাস্তায় হাত পাইতা ভিক্ষা করা আসলে একই কথা।

শরিফুল ইসলাম।। সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৬।
তথ্যসূত্রঃ য়্যুভাল হারারি, সেপিয়েন্স—মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

Comments

comments

353 views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *